32.8 C
Rajshahi
Thursday, November 26, 2020
Home সারাদেশ মানসিক হাসপাতালে এএসপিকে পিটিয়ে হত্যা: ১০ জন রিমান্ডে

মানসিক হাসপাতালে এএসপিকে পিটিয়ে হত্যা: ১০ জন রিমান্ডে

এফএনএস: রাজধানীর আদাবরে একটি মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য যাওয়া আনিসুল করিম শিপন নামে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গত সোমবার আদাবরের ‘মাইন্ড এইড’ নামের মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্রে এই ঘটনা ঘটে। নিহত আনিসুল করিম বরিশাল মহানগর ট্রাফিক পুলিশের সহকারী কমিশনারের পদে ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হত্যার বিষয়টি অস্বীকার করলেও সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিমের মৃত্যুকে হত্যাকা- বলে অভিহিত করেছে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হারুন অর রশীদ সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন। তিনি বলেন, চাকরির কারণে এএসপি আনিসুল বরিশালে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ করে তার মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করে পরিবার। তিনি চুপচাপ হয়ে যায়। এ চুপচাপের কারণে তাকে তারা এ মানসিক হাসপাতালে নিয়ে আসে। মানসিক হাসপাতাল থেকে হঠাৎ করে রোগী কীভাবে চলে গেলেন? সেখানে গিয়ে রোগী প্রথমে ভালো ছিলেন পরে দেখা গেল যে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছেন। আমরা ভিডিও ফুটেজে দেখলাম ৮-৯ জন লোক তাকে পিঠ মোড়াচ্ছে, তাকে মাথায় আঘাত করছে, তাকে বেঁধে ফেলছে এবং তাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনাকে হত্যাকা- দাবি করে ডিসি হারুন বলেন, ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় আমাদের কাছে স্পষ্ট মনে হয়েছে, এটা একটা হত্যাকা-। এজন্যই হত্যাকা- কারণ যে ১০-১২ জন লোক তাকে পিঠ বেঁধে, মুড়ে, আছড়ে নিয়ে গেছে, তারা কেউ ডাক্তার না।
এদিকে এএসপি আনিসুল করিম হত্যাকা-ের ঘটনায় গ্রেপ্তার হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়সহ ১০ জনের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল মঙ্গলবার গ্রেপ্তার ১০ জনকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য প্রত্যেককে ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদাবর থানার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ ফারুক মোল্লা। শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম শহিদুল ইসলাম প্রত্যেকের ৭দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিরা সবাই হাসপাতালে বাবুর্চি, ওয়ার্ডবয়, মার্কেটিং কর্মকর্তা ও কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কর্মরত। মামলার এজাহারে বর্ণিত ১১-১৫ নম্বর ক্রমিকে আসামিরা অনুমাদেন ব্যতীত হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে চিকিৎসার নামে অবৈধ অর্থ অর্জন করে আসছিল। এতে আরও বলা হয়, এই মামলার ভিকটিম আনিসুল করিমকে উন্নত চিকিৎসার আশায় মামলার বাদী গত ৯ নভেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তখন মানসিক চিকিৎসা দিতে পারেন এমন কোনো ডাক্তার হাসপাতালে কর্তব্যরত ছিলেন না। আসামিরা চিকিৎসা দেয়ার অজুহাতে ভিকটিমকে বলপ্রয়োগ করে হাসপাতালের দোতলায় স্থাপিত একটি অবজারভেশন কক্ষে নিয়ে যায়। আসামিরা ভিকটিমকে মারতে মারতে অবজারভেশন কক্ষে ঢোকায়। তা ঘাড়, পিঠ ও মাথাসহ শরীরে বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি আঘাত করে রুমের ওপর উপুড় করে ফেলে দেয়। কয়েকজন ভিকটিমের পিঠে চড়ে বসে, কয়েকজন মাথার ওপর আঘাত করে, কয়েকজন দুই হাত পিঠমোড়া করে ওড়না দিয়ে বাঁধে। আসামিদের এমন অমানসিক নির্যাতনে ভিকটিম আনিসুল করিমের মৃত্যু ঘটে। এজাহারনামীয় ১১-১৫ নম্বর ক্রমিকে বর্ণিত আসামিরা পলাতক। তাদের বর্তমান অবস্থান নির্ণয়পূর্বক গ্রেপ্তারের স্বার্থে পুলিশ হেফাজতে এনে ব্যাপক ও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন। এএসপি শিপনকে মারধরের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন- হাসপাতালের মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ মাহমুদ জয়, কো-অর্ডিনেটর রেদোয়ান সাব্বির, কিচেন সেফ মো. মাসুদ, ওয়ার্ডবয় জোবায়ের হোসেন, ফার্মাসিস্ট মো. তানভীর হাসান, ওয়ার্ডবয় মো. তানিম মোল্লা, সজীব চৌধুরী, অসীম চন্দ্র পাল, মো. লিটন আহাম্মদ ও মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ।
জানা গেছে, গত সোমবার দুপুর পৌনে ১২টায় মানসিক সমস্যার কারণে হাসপাতালে আসেন এএসপি আনিসুল করিম। অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালটিতে ভর্তির কিছুক্ষণ পরই মারা যান তিনি। হাসপাতালের অ্যাগ্রেসিভ ম্যানেজমেন্ট রুমে তাকে মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘক্ষণ অচেতন থাকা অবস্থায়ও তাকে ভর্তি কার্যক্রম করা হয়নি। কিছুক্ষণ পর ১২টার দিকে তাকে হাসপাতালের লোকজন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যায়। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান হাসপাতালে নেয়ার আগেই মৃত্যু (ব্রট ডেথ) হয় শিপনের। এ ঘটনায় আদাবর থানায় হত্যা একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আনিসুল করিম শিপনের বাবা বাদী হয়ে ১৫ জনকে আসামি করে এ মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৯।
হাসপাতালটির সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সকালে আনিসুল করিম শিপন হাসপাতালে ঢোকার পরই ৬-৭ জন তাকে টানাহেঁচড়া করে একটি কক্ষে নিয়ে যান। সেখানে তাকে মাটিতে ফেলে চেপে ধরেন। এ সময় মাথার দিকে থাকা দুজন হাতের কনুই দিয়ে তাকে আঘাত করছিলেন। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক আরিফ মাহমুদ তখন পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একটি নীল কাপড়ের টুকরা দিয়ে শিপনের হাত পেছনে বাঁধা হয়। চার মিনিট পর তাকে যখন উপুড় করা হয়, তখনই ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন শিপন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় তারা পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, মাইন্ড এইড নামে হাসপাতালটি অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে চিকিৎসার নামে অবৈধ অর্থ অর্জন করে আসছিলেন আসামিরা।
এদিকে, মোহাম্মদ আনিসুল করিমের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার কর্মস্থলে। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সহকারী কমিশনারের কক্ষটি এখন ফাঁকাই পড়ে রয়েছে। তবে সেখান রয়েছে তার স্মৃতি বিজরতি চেয়ার-টেবিল, টেলিফোন ও ফাইলপত্র। মোহাম্মদ আনিসুল করিম একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানিয়েছেন সহকর্মীরা। পাশাপাশি সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভালো আচরণ বজায় রাখতেন বলেও জানান তারা। তার এভাবে মৃত্যু যেমন সহকর্মীদের মানতে কষ্ট হচ্ছে, তেমনি পুলিশের এই মেধাবী কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও করেছেন সহকর্মীরা। বিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক মো. আবদুর রহিম জানান, সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুল করিম একজন নিষ্ঠাবান, সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। সহকর্মীদের সঙ্গেও তার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আর তাই পুলিশের এই কর্মকর্তার অস্বাভাবিক এ মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না। অন্য সবার মতো এই বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-পুলিশ কমিশনার মো. জাকির হোসেন মজুমদার এখন অনেকটাই মর্মাহত ও শোকাহত। তিনি জানান, সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আনিসুল করিমের সঙ্গে সবার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি যেমন সকলের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তেমনি দায়িত্বে প্রফেশনাল ও সৎ ছিলেন। ৯ নভেম্বর থেকে তিনি ১০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার আগের দিন ৮ নভেম্বরও নিজ কর্মস্থলে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ৩১তম বিসিএস-এ পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকারী এই কর্মকর্তা খুব মেধাবী ছিলেন। সে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও র‌্যাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশালে মেট্রোপলিটনে যোগদান করার আগে বরিশাল জেলা পুলিশের মুলাদী সার্কেলের দায়িত্বেও ছিলেন। মুলাদী সার্কেলে থাকা সহকর্মীরাও জানিয়েছেন, মেধাবী ও চৌকস কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনিসুল করিমের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে কখনো কোন অসঙ্গতি দেখতে পাননি তারা। সহকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন তারা। এদিকে আনিসুল করিমের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান-বিপিএম (বার)সহ কর্মকর্তারা। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের প্রত্যাশাও করেছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

মেসিকে ছাড়াও দুর্দান্ত বার্সেলোনা, শেষ ষোলো নিশ্চিত

এফএনএস স্পোর্টস: দুই ম্যাচ হাতে রেখেইে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে বার্সেলোনা। মার্টিন ব্রেথওয়েটের জোড়া গোলে গতকাল ডায়নামো কিয়েভকে ৪-০ গোলে...

মোরাতার শেষ মুহূর্তের গোলে জুভেন্টাসের জয়

এফএনএস স্পোর্টস: আলভারো মোরাতার শেষ মুহূর্তের গোলে হাঙ্গেরিয়ান ক্লাব ফেরেনভারোসকে ২-১ গোলে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শেষ ১৬ নিশ্চিত করেছে জুুেভন্টাস। মঙ্গলবার...

পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, রাজশাহী মহানগরের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন হওয়ায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা এমপি ও সাধারণ...

পররাষ্ট্রমন্ত্রী করোনায় আক্রান্ত

এফএনএস: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর গত মঙ্গলবার রাতে তার ফলাফল পজিটিভ আসে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের...

Recent Comments